Categories
যাপিত জীবন

শুক্রবার দিন: সাপ্তাহিক ঈদের দিন



আমাদের ছোটবেলায় সারা সপ্তাহ তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করে থাকতাম কখন শুক্রবার আসবে। এই দিনে বাসায় মোটামুটি ভালো-মন্দ খাবার রান্না করা হোত। সবচাইতে মজার বিষয় ছিল শুক্রবারে দুপুরবেলা বিটিভিতে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি সবাই মিলে দেখতাম। পিওর বিনোদন😁। দুপুরে খাবার পর আম্মু বাদাম ভেজে দিতো। ভাইয়া, আমি, আব্বু আমারা সবাই মিলে বাদাম খেতে খেতে সিনেমা দেখতাম। পুরা সপ্তাহে আব্বু ব্যবসায়িক ব্যস্ততার কারণে দুপুর বেলা বাসায় থাকত না। শুক্রবারে দুপুর বেলা বাসায় থাকতো, আমাদের সময় দিতো, একসাথে বসে সিনেমা দেখতাম অথবা কোন কোন মাসে বেড়াতে নিয়ে যেতো। তাই শুক্রবার আমাদের জন্য খুব আকাঙ্ক্ষিত একটি আনন্দময় দিন ছিল।

শুক্রবার এখনো আমার জন্য অনেক আগ্রহের একটা দিন। সারা সপ্তাহে কাজের পর যেই না বৃহস্পতিবার রাত আসে কেমন একটা আরাম আরাম ভাব হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিস নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। এটা ভেবেই কেমন এক আলস্যে ভরা সময় কাটানো শুরু করে দেই। বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দুজনে মিলে কি পড়ব বা কি মুভি দেখব ঠিক করি। এবং ছোটপুত্রকে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ি।🙄

শুক্রবার এর কথা মনে করে বেশ কিছু কাজ জমিয়ে রাখি। ঘরের বিভিন্ন জায়গা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা, পুরাতন জামা কাপড় বাদ দেয়া, কিছু স্পেসিফিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা, লেখালেখি করা, বান্ডিল বান্ডিল জমে থাকা খাতা শুক্রবারে বসে দেখবো বলে রেখে দেই। মোটকথা শুক্রবারে করবো বলে অনেক চিন্তাভাবনা করে কিছু কাজ আলাদা করে রাখি।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো এসব কাজের কোনটাই খুব বেশি একটা শুক্রবারে করা হয় না। ভোরবেলাতে যেহেতু অফিস থাকে না, তাই ছোট পুত্র যতক্ষণ জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে চায় ততক্ষণ তার সাথে শুয়ে থাকি। বেশ বেলা করে বিছানা ছাড়ি তার সাথে। অফিস ছুটির পাশাপাশি মনে মনেও যেন বাসার কাজ থেকে ছুটি নেই। ঘর সংসারের কাজে মন বসে না। স্লো মোশনে নড়াচড়া করি।

উদাসীন গৃহিণীর মনোভাব লক্ষ্য করে তাদের বাবা মাঝে মাঝে তাই শুক্রবারে সকালের নাস্তা বা দুপুরের খাবার বাহির থেকে অর্ডার করে ফেলে। মাঝে মাঝে আবার সদলবলে বাহিরে কোথাও খেতে চলে যাই। 🥰

ঘর সংসারের যাবতীয় কাজ একপাশে রেখে দেখা যায় শুক্রবার জুড়ে শুধু ঘুমাতেই ভালো লাগছে। সারা সপ্তাহের ক্লান্তি এই দু একটা দিনে যেন পুষিয়ে নিতে চাই। অফিস ছুটি থাকলে কি হবে ঘর সংসারের চারবেলা রান্নাবান্না থেকে তো ছুটি নেই। সাংসারিক কাজ, বাচ্চাদের দেখাশোনা, রান্নাবান্না যথানিয়মে এসব কাজ চলতে থাকে। একদিন ঘরের কাজকর্ম বন্ধ থাকলে পুরো বাসা রিফিউজি ক্যাম্পে পরিণত হয়। তাই ঘরকে ঘরের মতো রাখাও আসলে বড় একটা প্রশান্তির কাজ।

শুক্রবারে চেষ্টা করি খাবারের মেনুতে স্পেশাল আইটেম রাখতে। বাচ্চারা নিজের হাতে খেতে চেষ্টা করে তখন। ঐদিন দুপুরে দরজা খুলে যখনি পুত্র এবং তার বাবা মসজিদে যায় তখন চারপাশ থেকে বিভিন্ন ধরনের রান্নার সুবাস পাওয়া যায়। পোলাও, খিচুড়ি, বিরিয়ানি, রোস্ট ইত্যাদি নানা রকম বাহারি খাবার। ভালোই লাগে। আনন্দের একটা অনুভুতি হয়। শুক্রবার দিন আমাদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন, সেটাই খুব করে মনে হয়।

রান্নার সময় মনে হয় যে, ঘরের খাদেমা, বুয়া, গেটের দারোয়ান, গার্ড তারাও খাবারের ঘ্রাণ পাচ্ছে। তারা প্রতি সপ্তাহে বা প্রায় প্রতিদিন এভাবে ভালো ভালো মুখরোচক খাবার খেতে পারে?? তাদের সাথে ও তো আমাদের খাবার গুলো শেয়ার করা উচিত।

আমাদের ছোটবেলায়, যখনই দুপুরবেলা কোন ভিখারি আসতো, সব সময় আম্মুকে দেখতাম পেট ভরে তাদের খেতে দিতো। অন্যসময় আসলে তাদেরকে দুমুঠো চাল দিতাম, মাঝে মাঝে টাকা দিতাম, কিন্তু খাবারের সময় আসলে অবশ্যই আম্মু তাদেরকে খেতে দিতো। ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকার সুবাদে অনেক দিন ধরে বাসাবাড়িতে কোন ভিখারি আসেনা। কাউকে দান করা, খেতে দেওয়া, এ বিষয়টা বাচ্চারা দেখে না। খাবার শেয়ার করা, কাউকে খেতে দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো বোঝানোর জন্য বাচ্চাদের হাতে তাই খাবার বক্স করে নিচে পাঠিয়ে দেই। ওরাও আগ্রহ ভরে খাবার দিয়ে আসে। শুক্রবারে আনন্দ আমরা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।

মজার বিষয় হলো, নাস্তা খাবার যেটাই টুকটাক বানাই, আশেপাশে পাড়া-প্রতিবেশীকে দেয়ার চেষ্টা করি। তবে সব সময় তো পরিমাণে অনেক কিছু বানানো সম্ভব হয় না চারপাশে দেয়ার মতো। বাচ্চারা এত কিছু বোঝো না। কোন কিছু বানাতে দেখলে তারা বলে কোন বাসায় দিয়ে আসব, মা? 😊

আলসেমি দিয়ে শুরু হওয়া দিনটা, কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর হয়ে শেষ হয়। আলহামদুলিল্লাহ।