Categories
অভিজ্ঞতা যাপিত জীবন

উপলব্ধি

বাসার সাহায্যকারী মেয়েটিকে ছাড়া চলছে প্রায় দুই মাস হতে চলল। এই সময়টিতে বেশ কিছু উপলব্ধি হলো বাচ্চাদের বেড়ে উঠা নিয়ে।

আমার বাসায় টিভি চলেনা। একটি টিভি আছে শোপিস হিসেবে । বাচ্চারা সেখান থেকে কোন আউটপুট পায়না। তাদেরকে খাবার খাওয়ানোর সময় তাদের বাবা সিলেক্টেড কিছু কার্টুন বা এনিমেশন মুভি দেখায়। এর বাইরে কোন ডিভাইস তাদের হাতে দেয়া হয়না। তাই তারা এখনো অকালপক্ক হয়ে উঠেনি।

আর খেলাধুলার জন্য বাসার আশেপাশে যে বাচ্চাকাচ্চা আছে তাদের সাথে করে। মোটামুটি কাছাকাছি বয়সের একদল বাচ্চা এক সাথে খেলে। সবার মা-বাবা ও একই পেশাজীবী। তাই আশা করছি সবার মন মানসিকতা ও কাছাকাছি হবে।

এছাড়া বছরে দু-তিন বা দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি যায় চট্টগ্রামে। তখন হয়তো কিছু আপনজনের সাথে মেলামেশা হয়। এছাড়া বাইরের আর কারো সাথে তাই মেলা মেশা হয় না। দুনিয়ার জটিলতা আমার বাচ্চারা খুব একটা বোঝেনা। গরিব-ধনী ফর্সা কালো, চিকন মোটা, লম্বা বেটে এ জাতীয় জিনিস তারা এখনো বুঝে উঠেনি ভালো করে। পচা , বোকা, দুষ্ট -এতোটুকুই তাদের গালির ভান্ডার ।
কিন্তু এখন আস্তে আস্তে তারা বোঝা শুরু করেছে বিভিন্ন বিষয়। সেটাই আবিষ্কৃত হলো এ ক’দিন। যেহেতু শেয়ারিং কেয়ারিং সব এখন আমার হাতে।
সাহায্যকারী মেয়েটা ওদের সাথে থাকত দিনের বেশিরভাগ সময়। ওদের রুমে থাকত একসাথে। নায়রাহ সাড়ে তিন বছর বয়স থেকে মেয়েটার সাথে ঘুমায় এক বিছানায়। পড়া, খেলা, আঁকা, ঝগড়া ….. সব এক সাথে করতো । তার কাছ থেকে ওরা পাঠ নেওয়া শুরু করেছে , কিভাবে মিথ্যা কথা বলতে হয়, বদনাম করতে হয়। ভাই বোনের মাঝে দ্বন্দ্ব তৈরি করতো মেয়েটা । ওদের খেলনা লুকিয়ে রাগিয়ে দিতো!!! অমুক বিশ্রী, তমুক মোটা এই জাতীয় কথাবার্তা তারা শিখছে!!!

  অবাক হয়ে চিন্তা করলাম আমরা এত সতর্ক থাকি তবুও এই জিনিসগুলো ওদের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে !!!

সাহায্যকারী মেয়েটা না থাকায় আমার কাজ করতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তারা ভাই বোন এখন সব কিছু একসাথে করে। রাতে একসাথে ঘুমায়। এই ভাব, এই ঝগড়া- সব ই সমানে চলছে। আজেবাজে কাজ গুলো বুঝিয়ে বলা হয়েছে ওদের। নায়রাকে দিয়ে ঘর গোছানোর কাজ বা ছোট ভাইদের দেখার কাজ ও দেয়া হচ্ছে। (পোনে ছয় বছরের মেয়েটাকে দিয়ে টুকটাক কাজ করাই আর ভাবি মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে!! ক’দিন পর বিয়ে করে অন্য বাড়ি চলে যাবে )

অন্যদিকে বাচ্চারা যখন একসাথে নিচে খেলাধুলা করছে, তখন মেয়ে এসে একদিন বলল –  মা, ওরা বলছে আমি ওমুক ছেলেটার গার্লফ্রেন্ড !! (ওরা একই ক্লাসে পড়ে, কেজিতে) অবাক করা বিষয় তাই না !!

অন্য একদিন ওদের বাবা ওদের সহ আরো কজন বাচ্চাকে কিছু স্ন্যাকস কিনে দিল। কিন্তু ওখানে আরো বেশ কজন বাচ্চা দূরে ছিলো। তারা না পেয়ে মন খারাপ করেছে হয়তো!! ফলাফলে নায়রা কে খামাখা বকা দিয়েছে একজন। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সে বাসায় এসে বললো অমুক আপু আমাকে বকা দিয়েছে কোন কারণ ছাড়া!!! বেচারা মেয়েটাকে অন্য ভাবে বুঝিয়ে দিলাম, যাতে মন খারাপ না করে। এখনো চার বছর না হওয়া নাওঈদ খেলতে গিয়ে বড় এক ভাইয়ার থাপ্পড় খেল, যথাযথ কারণ ছাড়া। বোঝালাম এগুলো বড় হওয়ার একটা পার্ট!! কতোখানি বুঝলো কে জানে!!

আমি মা বাবা হিসেবে যতই সতর্ক থাকি না কেন, আমার চারপাশ , সমাজ থেকে বাচ্চারা অনেক কিছু না চাইতেই শিখবে। তারা কাদের সাথে বেড়ে উঠছে, তাদের মতোই আচরণ গুলো মন-মগজ দখল করে ফেলবে।

ছোটবেলা থেকেই তাদের চারপাশ গড়ে তোলার জন্য আমাদের আরো সতর্ক হতে হবে। আমরা বাসায় তাদের ভিত তৈরি করি। কিন্তু সমাজে গিয়ে সেটা পূর্ণতা পায়। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে মনে হয় বাচ্চাগুলো শুধু শুদ্ধ অন্তরের ভালো মানুষ হোক। মা-বাবার জন্য সাদকায়ে জারিয়া হয়ে বেড়ে উঠুক। আর কিছু চাওয়ার নেই।

প্যারেন্টহুড বেশ কঠিন একটা জব!!!